Saharai

সহরাই উৎসব ও আদিবাসী সমাজ কোন পথে।অনুলেখক – সত্য চরণ সরদার

Blog(ব্লগ) সংস্ক্‌তি

সহরাই উৎসব ও আদিবাসী সমাজ কোন পথে।
– সত্য চরণ সরদার সোনারপুর, কোলকাতা – ১৫০.

আদিবাসীদের উৎসব গুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান উৎসব সহরায় পরব বা উৎসব । আদিবাসীরা ফসল কাটার পূর্বে কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে প্রতিটি পরিবার এই উৎসব পালন করেন। বীজ বপনের পর ফসল আসার মুখে অর্থাৎ গর্ভবতী ফসলের ফলন ভালো হওয়ার পূর্বে এই উৎসব আদিবাসীরা করে থাকেন। আর ভালো ফসল উৎপাদনে গরুই প্রধান ভূমিকা থাকে। সেই গরুদের সম্মান প্রদর্শন ও ভালো ফসলের প্রার্থনায় এই উৎসবের আয়োজন। বর্তমানে এই উৎসব আদিবাসী বিভিন্ন সংগঠন গুলি জাতি সত্ত্বা বা অস্তিত্ব রক্ষা করতে সম্মিলিত ভাবে করে থাকে।

সহরাই উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে ভাল ফসল পাওয়ার জন্য গো মাতা বা বলদের ভূমিকা অগ্রগন্য। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই আদিকাল থেকেই আদিবাসীরা গোয়াল পূজা বা সহরাই পূজার মধ্য দিয়ে গরুদের শ্রদ্ধার সঙ্গে সম্মান প্রদর্শন করে।

সহরাই পরবে আদিবাসী মহিলারা চালের গুঁড়ো বা লাল মাটি জলে গুলে বিভিন্ন আল্পনা দিয়ে ঘর সাজান।
এই উৎসব সাধারণত কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে শুরু হয়। ইংরাজী অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আদিবাসীরা পালন করে থাকে।Saharai

এই উৎসব তিন দিনব্যাপী পালন করা হয় আবার কোন কোন জায়গায় পাঁচ দিনও পালন করা হয়ে থাকে। প্রথম দিনে আদিবাসীরা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে উপাসনা দিয়ে শুরু করে। পূর্বে প্রতিটি আদিবাসী পরিবারে নির্দিষ্ট থানে সাধারণত পূর্বপুরুষদের আরাধনার মধ্য দিয়ে সহরাই পূজার সূচনা।
বর্তমানে আদিবাসী সংগঠন গুলো সহরাই পূজার জন্য একটি জাহেরথান নির্দিষ্ট স্থানে তৈরি করে সকলে একসাথে সমবেত হয়ে এই পূজা বা শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করে। সম্মিলিত ভাবে এই পূজা করার আগে সবার বাড়ি থেকে চাল এবং মুরগী সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই মুরগী এবং চালের কিছু অংশ পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে পাহান বা পাড়ার মোড়লের নেতৃত্বে বলি দেওয়া হয়। এখানে বলিপ্রদত্ত মুরগী মাথা ও কয়েক ফোঁটা রক্ত সামনে পাতায় রাখা অল্প চালগুলোর মধ্যে ছিটিয়ে দেওয়া হয়।Saharai

পুজা সমাপ্ত হলে সেই মুরগী মাংস এবং চাল দিয়ে পোলাও রান্না করা হয়। রান্না সমাপ্ত হলে প্রথমে সেই রান্নার একটি অংশ গ্রামের নির্জন স্থানে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্য নিবেদন করা হয়। সেই রাতে খাওয়া দাওয়া সম্পন্ন হলে পরের দিনের অনুষ্ঠানের জন্য তারা প্রস্তুত হয়। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠান নাঢ গান সহযোগে সম্পন্ন হয়ে থাকে।

দ্বিতীয় দিন পুরোটাই পশুদের উদ্দেশ্যে উৎযাপন করা হয়, পশুদের স্নান করানো হয় । এই দিনের শুরুতে সবাই রান্না করা ভাত এবং একটি করে ডিম নেন। পশুরা যে রাস্তার চলাচল করে সেই রাস্তায় সেগুলো রেখে দেওয়া হয়, যাতে পশুদের আঘাতে ডিম গুলো ভেঙ্গে যায়। এই দিনে পশুদের স্নান করিয়ে পশুদের শরীরে, শিং এ তেল মাখানো হয় এবং পা ধুয়ে দেওয়া হয়। এটা এমন ধরনের উৎসব যাতে পশুদের প্রতি সম্মান দেখানো হয়। এই সব কিছু শেষ হলে সবাই ঘরের দিকে যায়।
মাঠ থেকে ধানের গাছ নিয়ে আসেন এবং এটা পুজায় এটা ব্যবহৃত হয়। পুজার পর তারা সেই ধানগাছের গোছা পশুদের শিং এ বেঁধে দেয়। সহরায় উৎসবে পূর্ব পুরুষদের নামে উৎসর্গ করে থাকে। মূলতঃ সহরাই পারিবারিক পূজা। এই পুজার মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে আর্শীবাদ ও সুখী জীবন কামনা করে থাকে।

এই রাত থেকে পশুদেরকে লোকেরা জাগায় এবং বাড়ী বাড়ী গিয়ে নাচ-গান করে থাকে। তৃতীয় দিন পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে।Saharai

উৎসবের তৃতীয় দিনে গবাদী পশুদের এক জায়গায় বেঁধে রাখা হয় এবং একজন ব্যক্তি শুকনো কোন চামড়া সেই পশুটির নাকের সামনে ধরে। এতে পশুটি খিপ্ত হয়ে সেই শুকনো চামড়াটিকে শিং দিয়ে আঘাত করে। এ রকম বিষয়টি পর পর তিন বার করা হয় এবং প্রতিবারেই ভিন্ন ভিন্ন গান গেয়ে পর্বটি পালন করা হয়ে থাকে। এভাবে প্রতিটি পশুকে তারা বাধার মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে। সহরাই এর এই পরব বা উৎসবকে বাঁধনা পরব বা উৎসব বলে।

বাস্তবতা:
সংস্কৃতি সবসময় চলমান একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াটা মুলত সভ্যতার সাথে সাথে চলতে শুরু করেছে। বিকশমান সংস্কৃতির ধারায় যেমন অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে আবার অনেক কিছুই কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে। প্রায় সব সংস্কৃতির বিরাট অংশ জুড়ে ধর্ম জাড়িয়ে থাকার দরুন এটা ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তনের সাথে সাথে এর প্রকার, এর আচার, এর পরিপালনও পরিবর্তিত হয়েছে। আবার অর্থনৈতিক অবস্থার দরুনও সংস্কৃতির অনেক বিষয়গুলো পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

আদিবাসীদের বর্তমান প্রেক্ষাপট কিছুটা বদলে গিয়েছে। বাঙালী সংস্কৃতির জায়গাটাতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশাসন যুক্ত হয়েছে। আদিবাসীরা এর বাইরে যেতে পারেনি। আমরা অস্বীকার করতে পারব না যে, বাস্তব পরিস্থিতির বিপরীতে চলে, টিকে থাকা অনেক কঠিন।

বর্তমানে শহরতলির ৫% আদিবাসীরা অর্থনৈতিক দিক থেকে বিত্তবান এবং ধর্মীয় বিশ্বাসে সারনা বা সারি ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বললেও আদিবাসী ধর্মকে জাতীয় স্তরে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করার মতো কোনো তৎপরতা দেখাতে চান না।

অন্য দিকে গ্রামের ৯৫% গরীব আদিবাসী সরাই বা অন্যান্য পরব বা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান গুলো তাদের মতো করে পালন করেন।

বর্তমানে ধর্মান্তরিত হিন্দু আদিবাসীর সংখ্যাই বেশী। খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত আদিবাসীর সংখ্যা নিছক কম নয়। এমতাবস্থায় তাদের সংস্কৃতি কি পরিমান বেসামাল হতে পারে, তা একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়।

আদিবাসীদের শিক্ষিত অংশ আদিবাসী সংস্কৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছেন। এখনও সময় আছে আদিবাসী শিক্ষিত মানুষেরা তাদের সংস্কৃতিকে বাঁঢাতে তৎপর হলে তাদের অস্তিত্ব টিকে থাকবে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে ধর্মান্তরিত হলেও আদিবাসী সংস্কৃতিকে লালন পালন করতে আশা করি কোন বাঁধা নেই।

সহরাই শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টি বিশ্বাস এবং উপাসনার পর্যায়ে নিমজ্জিত। বর্তমান ধর্মান্তরিত আদিবাসীরা যখন এ রকম অনুষ্ঠান করতে তৎপরতা দেখালে তার গুরুত্ব বা মর্যাদা অন্যমাত্রা পেতে পারে বৈকি।

একটা সময় ছিল, যখন আদিবাসীদের গলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ আদিবাসীদের গলা ভরা ধান নেই, পুকুর ভরা মাছ নেই, গোয়াল ভরা ধানও নেই। তাহলে কিভাবে এই উৎসব পালন করবে? যে উৎসবটির মুলে রয়েছে, ফসলের জন্য প্রার্থনা, গবাদি পশুর প্রতি সম্মান জানানো। আজ যাদের কিছুই নেই, তারা কিভাবে উৎসবটি করবে?

পূর্বেই বলে ছিলাম সংস্কৃতি সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। যে কারণগুলোর জন্য সংস্কৃতির এই আচার আচরণ সেই কারণ গুলো যদি না থাকে, তাহলে কি সেটা পালন করা কতটা যুক্তিযুক্ত।

পরিবর্তনশীল এই সংস্কৃতির জায়গায় আদিবাসীরা কি তাদের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলছে? এ রকম প্রশ্নের অবতারণা হতে পারে। এ প্রশ্নের উত্তরে শুধু আদিবাসীদের দিকে অঙ্গুলি তুললে কিছুটা অন্যায় করা হবে বৈকি। আধুনিক সভ্যতার সংস্কৃতির ধারায় আজ সারা পৃথিবীতে জাতিগুলোর সামনে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা এবং পতিপালন করা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাহলে এই পরিস্থিতিতে কি করা যেতে পারে? কয়েকটি পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।

১। সংস্কৃতির মধ্যে ধর্মের সাথে যে বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত, সেই বিষয়গুলো নিয়ে সমাজে আলোচনা হতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে সরাসরি আঘাত করে না বা ব্যহত করে না এমন বিষয়গুলো আদিবাসীরা পালন করতে পারে। আবার ধর্মীয় অংশটুকু বাদ দিয়েও সেই বিষয়গুলো তারা করতে পারে।
অথবা
সারনা বা সারি ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আদিবাসী সত্ত্বাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা যেতে পারে।

২। সংস্কৃতির বিরাট একটা অংশ জুড়ে কৃষ্টি ও কালচার রয়েছে। যা সরাসরি ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। সেই বিষয়গুলো অনুশীলন করে, বর্তমান আদিবাসী সমাজ তাদের পরিচয় বহন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভাষার সঠিক চর্চার মাধ্যমে একটা জাতির পরিচয় অক্ষুন্ন থাকতে পারে।

৩। সংস্কৃতির মধ্যে সমাজ কাঠামোগুলো অন্তর্ভুক্ত। সমাজ কাঠামোকে যদি আর গতিশীল এবং সত্যিকার নিয়ামক করা যায়, তাহলে আদিবাসী হিসেবে নিজের পরিচয় টুকু ধরে রাখা সম্ভব।

৪। উৎসবহীন জাতি নিরামিষ জাতি। উৎসব বিহীন একটি জাতি কল্পনা করাটাও কঠিন। তাই জীবনে উৎসবগুলো থাকা উচিত। কিন্তু সেই উৎসব গুলোর মধ্যে অবশ্যই উন্নয়ন বা উন্নতির ধারাবাহিকতা থাকা উচিত। অর্থাৎ উৎসবের মধ্যেও যাতে নিজেদের উন্নতি থাকে সেদিকে মনোযোগ দিলে জাতি হিসেবে আদিবাসীরা আরও এগিয়ে যেতে পারবে।

সময়ের সাথে সারা বিশ্ব যখন এগিয়ে চলছে। আদিবাসীরা পিছিয়ে থাকবে এমনটা হতে পারে না। প্রসঙ্গতঃ দক্ষিণ আমেরিকার অনেক আদিবাসী আজ তাদের সংস্কৃতিকে ঢেলে সাজাচ্ছে। তারা সেটা করেও বিশ্বের কাছে আদিবাসী হিসেবে পরিচিত, সমাদৃত। আমরা তাহলে কেন পারবো না? নিশ্চয় পারবো, শুধু আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে, ঠুনকো আবেগ গুলো থেকে। বেরিয়ে আসতে হবে, ধর্মীয় রেষারেষি থেকে। বেরিয়ে আসতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ দ্বন্দ্ব থেকে।

                                 

  satya charan sardar অনুলেখক – সত্য চরণ সরদার (সম্পাদক), নাওয়াঁ বিহান পত্রিকা ।.

78Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.