‘জানো তারপর মানো’ ‘গোলামি নয় মুক্তি চাই’ /ব্লগ পোস্ট /লেখিকা-ললিতা হেমব্রম

Blog(ব্লগ) মতামত

          এদেশে মহিলারা আজ সবচেয়ে নির্যাতিত,নিগৃহীত। দৈনন্দিন খবরের কাগজ,টেলিভিশনের পর্দায় অত্যাচারের কাহিনী চোখে পড়ে। ছোট ছোট শিশুরাও বাদ যায় না। অথচ এদেশের অসুর সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা ছিল মাতৃতান্ত্রিক সভ্যতা। যে সভ্যতা অশ্বারোহী বর্বর আর্যরা লৌহ অস্ত্রের দ্বারা ধ্বংস করেছিল। মৃতের নগরী বানিয়েছিল মহেঞ্জোদাড়োকে। এই নিরীহ মাতৃততান্ত্রিক পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সভ্যতাকে ধ্বংস করে,বিকৃত এক সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল । আর্যরা সম্ভবত মহিলাদের নিয়ে আসে নি। তাই মাতৃতান্ত্রিক নিরীহ সভ্যতাকে বর্বর পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতায় পরিণত করেছিল । যারা পালিয়ে গিয়েছিল আজও পাহাড়ে পর্বতে সেই মাতৃতান্ত্রিক রাজ্য ।

             ব্রাহ্মণ্যবাদ মহিলাদের ওপর যে ধরণের বর্বর ও নৃশংস তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত, সামান্য দু’একটা উদাহরণ দিলে তা বোঝা যাবে। যা এক বিকৃত রুচির ব্রাহ্মণ্যবাদীরর ভারত উপহার দিয়েছে।

              ১) ইন্দ্র দেবতার সভায় রম্ভা,উর্বশী,মেনকা নাচবে। কখনো কি মনে হয় নি একজন দেবতা কেন মহিলাদের নাচাবে?  শিশুদের কাছেও বা এ বিষয়ে কি বার্তা পৌছচ্ছে ?

             ২) শাস্ত্রে বলছে ‘নারী মাত্রি শূদ্রানি’, তার সম্পদ রাখার কোন অধিকার নেই। প্রথম জীবনে পিতার অধীন, যৌবনে স্বামীর অধীন,বার্ধক্যে পুত্রের অধীন। দাসত্ব করা ছাড়া তার কোন অধিকার নেই । তাই বিয়ে করতে যাওয়ার ছেলে মাকে বলে ‘আমি দাসী আনতে যাচ্ছি তোমার জন্য ‘।

            ৩) নারী মাত্রেই শূদ্রানি হওয়ার কারণে মূর্খ ব্রাহ্মণ কে লোকে পূজা করতে ডাকে,কিন্তু শিক্ষিত ব্রাহ্মণী কে কেউ পূজা করতে ডাকে না। আজও যা বলবৎ আছে । এ কথা কেউ ভেবেছেন কি ?

           ৪) কুলীন ব্রাহ্মণ ৭০-৮০ টা বিয়ে করত। এমনকি মৃত্যুপথযাত্রী ব্রাহ্মণ সেও বিয়ে করতে পিছ পা হচ্ছে না ১২ বছরের মেয়েকে। তারপর সে মারা গেলে স্বামীর চিতায় জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হত। কি নৃশংস। কেউ পালিয়ে গেলে মাথার চুল কেটে দেওয়া হত। অগুণতি বিবাহের কয়েকটা উদাহরণ :

নবকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাড়ি-ক্ষীরপাই ৫২ বছর বয়স পর্যন্ত ৫০টি বিয়ে করেছেন। দেশমুখো হুগলি জেলা নিবাসী ভগবান চট্টোপাধ্যায় ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত ৭২ টি বিয়ে করেছেন। এরকম আরো উদাহরণ আছে। (তথ্যসূত্র-বিদ্যাসাগর রচনা সমগ্র – বহুবিবাহ)

          এরাই আবার সমাজের মাথা, মহিলাদের নিয়ে ভাল কিছু ভাবতে পারবে?  এরা মহিলাদের শুধু ব্যবহারই করবে।

           ৫) মহিলাদের জোর করে মন্দিরের সেবাদাসী /দেবদাসী করা হত।

           ৬) কারোর সন্তান না হলে ব্রাহ্মণ তাদের শয়ণ ঘরে আলো জ্বেলে শাস্ত্র পাঠ করবে তাদের মিলিত হওয়ার সময়। কতটা অসভ্যতা!!!!!!????

           ৭) গৌতম মুনির স্ত্রী অহল্যা। মুনি যখন বাইরে গেছেন দেবতা ইন্দ্র সেই সময় মুনির ছদ্মবেশে অহল্যার সংগে মিলিত হয়। ঋষি গৌতম ফিরে এসে জানতে পেরে অহল্যাকে পাষাণ করে দিল ।  কার দোষে কে শাস্তি পেল ।

         ৮) বাবা-মা মারা গেলে এক কাপড়ে রাখতে হয়-সায়া ব্লাউজ বা দ্বিতীয় কোন বস্ত্র দেওয়া হয় না। এ শুধু নৃশংসতাই নয়,মহিলাদের লজ্জা নিবারণের অধিকার টুকুও কেড়ে নেওয়া ।

          ৯) পেটে বাচ্চা এলে ট্যাক্স, বাচ্চা হলে ট্যাক্স, বিয়ে করতে গেলে ট্যাক্স, মরেও শান্তি নেই, শ্রাদ্ধে ট্যাক্স এমনকি আবার বছরকির নামেও প্রতি বছর ট্যাক্স। পূজায় ব্রাহ্মণ কে ট্যাক্স,  মন্দিরে গেলে ব্রাহ্মণ কে ট্যাক্স, এইভাবে যে ব্রাহ্মণ রা আমাদের কাছে প্রতিমুহূর্তে দিনে দুপুরে ডাকাতি করে নিচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি না।

           ১০) রাধা কৃষ্ণের মামীমা, তার সংগে কৃষ্ণের প্রেম?  এটা কি সুস্থ সংস্কৃতি না সুস্থ পরিবেশ তৈরির পক্ষে সহায়ক এই ধরণের প্রচার প্রসার।

   মনুসংহিতায় নারী

        (পঞ্চম-১৪৮) বাল্যকালে নারী তার পিতার অধীন,যৌবনে স্বামীর অধীন,স্বামীর মৃত্যুর পর পুত্রের অধীন, নারী কখনো স্বাধীন থাকবে না ।

         (নবম-১৪৬) স্ত্রী, পুত্র,দাস তিনজনের ই কোন সম্পত্তিতে অধিকার নেই।

         (অষ্টম -২৯৯) স্ত্রী, পুত্র,দাস দোষ করলে দড়ি বা কঞ্চি দিয়ে মারা যাবে ।

         (নবম-১৮) মহিলাদের বেদ পাঠের অধিকার নেই ।

         (চতুর্থ -২০৫) নারী কর্তৃক প্রদত্ত যজ্ঞের খাদ্য ব্রাহ্মণ গ্রহন করবে না।

         (চতুর্থ -২০৬) নারীর দেওয়া দান অশুদ্ধ,ঈশ্বর তা গ্রহণ করেন না।

         (নবম -১৬) বিক্রি বা পরিত্যক্ত হলেও স্ত্রী স্বামীর থেকে মুক্তি পান না।

             মহিলাদের ওপর এরকম অত্যাচারের কাহিনী হাজারো তুলে ধরা যেতে পারে, এই অবস্থার ফলে আজ মহিলারা ব্রাহ্মণ্যবাদের মানসিক গোলামে পরিণত হয়েছে ।

          বর্তমানে মূলনিবাসী মহিলারা শুধুমাত্র পুরুষের গোলাম নয়,ব্রাহ্মণদের পায়ে আছড়ে পড়ছে। এই মানসিকতার ফলে তাদের সন্তান রাও সুস্থ স্বাধীন মানসিকতার পরিবর্তে গোলামীর মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে।

                       এর থেকে মুক্তি চাই কি না?  তার সিদ্ধান্ত আজই নিতে হবে। অনেক দেরি হয়েছে আর নয় ।’ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর ‘ এ হলো গোলামির মন্ত্র । ‘ জানো তারপর মানো’ – এ হলো মুক্তির মন্ত্র’।  বিতর্ক তৈরি করুন,সিদ্ধান্ত নিন।

7Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published.